ফাতেমা তুজ জোহরা - যার কণ্ঠে প্রাণ পায় নজরুলের গান
ফাতেমা তুজ জোহরা
জেলা- জয়পুরহাট
লেখকের নাম- নাঈমা পারভীন
প্রকাশকাল- ২৩ মার্চ ২০২৫
ফাতেমা তুজ জোহরা: যার কণ্ঠে প্রাণ পায় নজরুলের গান
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বহু গান রচনা করে গেছেন তাঁর জীবদ্দশায়। সেসব গান সব সময়ই বাঙালির হৃদয়ে মিশে আছে গভীরভাবে। তবে গানগুলোকে যাঁরা মানুষের হৃদয় অব্দি পৌঁছে দিয়েছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন সংগীতশিল্পী ফাতেমা তুজ জোহরা। নজরুল সংগীতের প্রসঙ্গ উঠলেই তাঁর নামটি উচ্চারিত হয় অবশ্যই। তার কণ্ঠেই যেন প্রাণ প্রায় নজরুলের গান। নজরুল প্রতিভা নিয়ে সঙ্গীতচর্চায় নিমজ্জিত থাকলেও সবধরনের গায়কীর পারদর্শিতা তাঁর রয়েছে। খুব ছোটবেলা থেকে গানের সাথে বেঁধে ফেলেন নিজেকে।
প্রারম্ভিক জীবন:
ফাতেমা তুজ জোহরা তৎকালীন বৃহত্তর বগুড়া জেলার জয়পুরহাটে এক সংস্কৃতিমনা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মরহুম ডা. সৈয়দ ফরিদ উদ্দীন, মা মিসেস ফজিলেতুন্নেসা। বাবা সরকারি ডাক্তার হওয়াতে তার ছোটবেলা কেটেছে জয়পুরহাট সহ বিভিন্ন জেলা শহরে।
ফাতেমা তুজ জোহরা জয়পুরহাট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। সেই সময় থেকে তিনি সঙ্গীত চর্চা শুরু করেন, পাশাপাশি অভিনয়ও করতেন। জোহরা সঙ্গীতচর্চা শুরু করেন ১৯৬৩ সালে হাবীবুর রহমান সাথীর নিকট। তিনি ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত তাঁর নিকট সঙ্গীতের তালিম গ্রহণ করেন। এরপর তিনি মিথুন দে'র নিকট সঙ্গীতের তালিম নেন। এছাড়া তিনি নগেন ঘোষ এবং রফিকুল আলমের কাছে গানের তালিম নেন। গান শেখা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "আমার বাবা বা আমার গুরুরা, ওস্তাদ হাবীবুর রহমান, নগেন ঘোষ ও রফিকুল আলম, কেউ আমাকে বলে নি যে বড় শিল্পী হতে হবে, বরং তারা আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে সঠিকভাবে গান করতে হয়।"
সংগীত জীবন:
ফাতেমা তুজ জোহরা প্রথম মঞ্চে গান করেন স্কুলে অর্থাৎ ক্লাস ফাইভে পড়াকালীন। এরপর থেকে এগিয়ে চলে তার গানযাত্রা। ১৯৭৫ সালে প্রথম রেডিওতে এবং ১৯৭৭ সালে টেলিভিশনে গান করেন তিনি। তাঁর কণ্ঠে সব মিলিয়ে প্রায় ২০টি অ্যালবাম বের হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- শ্যাম তুমি, তুমি বেশ বদলে গেছো, আমার এ ভালোবাসা (আধুনিক), সে আসে রুদ্রবীণায়, রূপের বাজারে (আধুনিক) প্রভৃতি।
অভিনয় জীবন:
ফাতেমা তুজ জোহরা ১৯৮৪ সালে খ. ম. হারুন পরিচালিত ‘লাগুক দোলা’ নাটকের মাধ্যমে টেলিভিশন নাটকে অভিনয় শুরু করেন। এই নাটকে তিনি একটি নির্বাক মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। তার পরবর্তীতে তিনি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত গল্প অবলম্বনে নির্মিত ‘শিউলি মালা’ নাটকে এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত গল্প অবলম্বনে নির্মিত ‘শেষের রাত্রি’ (২০১২) এবং ‘ঘাটের কথা’ (২০১৭) নাটকে অভিনয় করেন।
সাহিত্য জীবন:
ফাতেমা তুজ জোহরা তার কলেজ জীবন থেকে লেখালেখি শুরু করেন। ১৯৯২ সালে তিনি তার প্রথম কবিতার বই ‘যেখানে ভালোর বাস’ প্রকাশ করেন। তিনি নিয়মিত "শব্দঘর" পত্রিকায় কলাম লিখতেন। পরে তার সেই কলামের সংকলনসহ এবং কয়েকটি গল্প সংবলিত ‘কিছু নিয়ে কিছু কথা’ প্রকাশিত হয়। তিনি ছড়ার ওপর দুটি বই - ‘তাল বাহারি ছড়া’ ও ‘ছড়ায় গড়ে বোল’ প্রকাশ করেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ভিত্তিক একটি উপন্যাস রচনা করেন। ২০১৭ সালের অমর একুশে বইমেলায় নজরুল সংগীতের ওপর তার রচিত ‘গীত ও সুরের ভিন্ন ঊর্মিমালায়: নজরুল সঙ্গীত’ বইটি অনিন্দ্য প্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়।
ব্যক্তিগত জীবন:
ফাতেমা তুজ জোহরার স্বামী বীর মুক্তিযোদ্ধা একেএম নুরুজ্জামান। তিনি পেশায় একজন প্রকৌশলী ছিলেন। তাঁদের তিন সন্তান তমা, উজান ও তৃতীয়া। ফাতেমা তুজ জোহরা তাঁর মেয়ে নাজিয়া বিশকাত তমার সাথে যৌথভাবে মিশ্র অ্যালবাম প্রথম প্রদীপ জ্বালো প্রকাশ করেন।
সম্মাননা:
• সঙ্গীতে অবদানের জন্য একুশে পদক (২০০৬)
• প্রেস ক্লাব পুরস্কার
• নজরুল পুরস্কার
• থিয়েটার সম্মাননা
• শের-এ-বাংলা স্মৃতি পদক
• স্বাধীনতা ফোরাম সম্মাননা
• লন্ডন থেকে শুদ্ধ মঞ্চ পুরস্কার
• ব্রিটিশ কলম্বিয়া সম্মাননা পুরস্কার[২]
• বাংলা একাডেমির ফেলো (২০১৫)
• নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় পুরস্কার (২০১৫)
• নজরুল ইনষ্টিটিউট পুরস্কার
বাংলা গানের ইতিহাসে তিনি এক অনন্য নাম। তাঁর গানগুলো বাংলা সাংস্কৃতির আঙিনায় চিরকাল বেঁচে থাকবে। এই কিংবদন্তি শিল্পীর জন্য বিনম্র শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন
© কথার কাগজ

.jpg)


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন