বেগম সুফিয়া কামাল: জননী সাহসিকা

বেগম সুফিয়া কামাল: ছবি- বাংলার সাহিত্য
লিখেছেন- নাঈমা পারভীন

বেগম সুফিয়া কামাল বাংলাদেশের একজন প্রথিতযশা কবি, লেখিকা ও আধুনিক বাংলাদেশের নারী প্রগতি আন্দোলনের একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব।

জন্ম ও শৈশব
বেগম সুফিয়া কামাল ১৯১১ সালের ২০ জুন বরিশালের শায়েস্তাবাদে মামাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা সৈয়দ আবদুল বারী এবং মা সৈয়দা সাবেরা খাতুন। তার বাবা কুমিল্লার বাসিন্দা ছিলেন। সুফিয়া কামালের ডাকনাম ছিল হাসনা বানু। আরব্য উপন্যাসের হাতেম তাইয়ের কাহিনি শুনে নামটি রেখেছিলেন তার নানি। তবে দরবেশ নানা তার নাম রেখেছিলেন সুফিয়া খাতুন। ‘একালে আমাদের কাল’ শীর্ষক লেখায় সুফিয়া কামাল তার জন্ম প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘মাটিকে বাদ দিয়ে ফুল গাছের যেমন কোনো অস্তিত্ব নেই, আমার মাকে বাদ দিয়ে আমারও তেমন কোনো কথা নেই।’

সুফিয়া কামালের বাবা সৈয়দ আবদুল বারি পেশায় ছিলেন উকিল। সুফিয়া কামালের যখন সাত বছর বয়স তখন তার বাবা গৃহত্যাগ করেন। ফলে তার মা সাবেরা খাতুন অনেকটা বাধ্য হয়ে তাকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন। এ কারণে তার শৈশব কেটেছিল নানাবাড়িতে। বাবার অনুপস্থিতিতে তিনি মা সৈয়দা সাবেরা খাতুনের পরিচর্যায় লালিত-পালিত হতে থাকেন। তার মা ছিলেন শায়েস্তাবাদের নবাব পরিবারের মেয়ে। সেই পরিবারের কথ্য ভাষা ছিল উর্দু। এ কারণে অন্দরমহলে মেয়েদের আরবি, ফারসি শিক্ষাব্যবস্থা থাকলেও বাংলা শেখানোর কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তিনি বাংলা শেখেন মূলত তার মায়ের কাছে। তার বড় মামার একটি গ্রন্থাগার ছিল। মায়ের উৎসাহ ও সহায়তায় সেখানে বই পড়ার সুযোগ হয়েছিল তার। সাহিত্যচর্চার সূচনা ১৯২৪ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে মামাতো ভাই সৈয়দ নেহাল হোসেনের সঙ্গে সুফিয়ার বিয়ে দেওয়া হয়। তখন তিনি সুফিয়া এন হোসেন নামে পরিচিত হন। তিনি সুফিয়া কামালকে সমাজসেবা ও সাহিত্যচর্চায় উৎসাহিত করেন। সাহিত্য ও সাময়িক পত্রিকার সঙ্গে সুফিয়ার যোগাযোগও ঘটিয়ে দেন। সুফিয়া কামাল সে সময়ের বাঙালি সাহিত্যিকদের লেখা পড়তে শুরু করেন। ১৯১৮ সালে কলকাতায় গিয়েছিলেন সুফিয়া কামাল। সেখানে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল। সুফিয়া কামালের শিশুমনে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছিলেন বেগম রোকেয়ার কথা ও কাজ। সুফিয়া কামালের কাজকর্মেও ছাপ পাওয়া যায় বেগম রোকেয়ার। সাহিত্যপাঠের পাশাপাশি সুফিয়া কামাল সাহিত্য রচনাও শুরু করেন। ১৯২৩ সালে তিনি রচনা করেন তার প্রথম গল্প ‘সৈনিক বধূ’, যা বরিশালের ‘তরুণ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯২৬ সালে তার প্রথম কবিতা বাসন্তী সেসময়ের প্রভাবশালী সাময়িকী সওগাতে প্রকাশিত হয়। ত্রিশের দশকে কলকাতায় অবস্থানকালে বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র প্রমুখের দেখাও পান। ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত হয় তার ‘সাঁঝের মায়া’ কাব্যগ্রন্থ। এর ভূমিকা লিখেছিলেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। গ্রন্থটি পড়ে প্রশংসা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। একটি চিঠিতে সুফিয়া কামালকে তিনি লেখেন, ‘তোমার কবিত্ব আমাকে বিস্মিত করে। বাংলা সাহিত্যে তোমার স্থান উচ্চে এবং ধ্রুব তোমার প্রতিষ্ঠা।’ সুফিয়া কামাল ‘একালে আমাদের কাল’ নামে একটি আত্মজীবনী রচনা করেছেন। তাতে তার ছোটবেলার কথা এবং বেগম রোকেয়ার প্রসঙ্গ স্থান পেয়েছে। তিনি অনেক ছোটগল্প এবং ক্ষুদ্র উপন্যাসও রচনা করেছেন। কেয়ার কাঁটা তার একটি উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ। তার আরো কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো মায়া কাজল, মন ও জীবন, উত্তপ্ত পৃথিবী, অভিযাত্রিক ইত্যাদি। তার কবিতা চীনা, ইংরেজি, জার্মান, ইতালিয়ান, পোলিশ, রুশ, ভিয়েতনামিজ, হিন্দি ও উর্দু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯৮৪ সালে রুশ ভাষায় তার সাঁঝের মায়া গ্রন্থটি সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে প্রকাশিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়ও তার বেশকিছু কবিতা প্রকাশিত হয়। মুসলিম নারীদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করার জন্য বেগম রোকেয়ার প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলামে’ রোকেয়ার সঙ্গে সুফিয়া কামালের পরিচয় হয়। বেগম রোকেয়ার চিন্তাধারা ও প্রতিজ্ঞা তার মধ্যেও সঞ্চারিত হয়, যা তার জীবনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। সামাজিক কর্মকাণ্ড সুফিয়া কামাল সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সমাজসেবা ও বিভিন্ন সংগঠনে যুক্ত ছিলেন। সমাজসেবা ও সংগঠনমূলক কাজের বিষয়ে সুফিয়া কামাল বর্ণনা করেন, “প্রথম জীবনে কাজ করার পর ১৮ থেকে ২০ বছর বয়স পর্যন্ত আমি বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের প্রতিষ্ঠিত কলকাতার ‘আঞ্জুমান মাওয়াতিনে’ কাজ করি। এই প্রতিষ্ঠানের কাজ ছিল কলকাতার বস্তি এলাকার মুসলমান মেয়েদের মনোভাবে একটু শিক্ষিত করে তোলা। এরপর তিনি ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের সময় বর্ধমানে এবং ১৯৪৬-এর ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’-এর হিন্দু মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর বিপন্ন এবং আহতদের মধ্যে কাজ করেন। ১৯৪৮ সালে বেগম সুফিয়া কামাল ব্যাপকভাবে সমাজসেবা ও রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। তিনি হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি রক্ষার উদ্দেশ্যে শান্তি কমিটিতে যোগ দেন। এ বছরই তাকে সভানেত্রী করে ‘পূর্ব পাকিস্তান মহিলা সমিতি’ গঠিত হয়। ১৯৪৯ সালে তার যুগ্ম সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সুলতানা পত্রিকা, যার নামকরণ করা হয় বেগম রোকেয়ার সুলতানার স্বপ্নগ্রন্থের প্রধান চরিত্রের নামানুসারে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সুফিয়া কামাল সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। শুধু তা-ই নয়, পাকিস্তান সরকার বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর দমন-নীতির অংশ হিসেবে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে তিনি তার বিরুদ্ধেও তীব্র প্রতিবাদ জানান। ১৯৫৬ সালে শিশুদের সংগঠন কচিকাঁচার মেলা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬৯ সালে ‘মহিলা সংগ্রাম পরিষদ’ (বর্তমানে-বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ) গঠিত হলে তিনি তার প্রতিষ্ঠাতা প্রধান নির্বাচিত হন এবং আজীবন তিনি এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। স্বাধীনতার পরও বেগম সুফিয়া কামাল অনেক সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেন। তিনি যেসব সংগঠনের প্রতিষ্ঠাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন সেগুলো হলো বাংলাদেশ মহিলা পুনর্বাসন বোর্ড, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন কমিটি এবং দুস্থ পুনর্বাসন সংস্থা। এ ছাড়া তিনি ছায়ানট, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন এবং নারী কল্যাণ সংস্থার সভানেত্রী ছিলেন। সাহিত্যকর্ম কাব্যগ্রন্থ • সাঁঝের মায়া (১৯৩৮) • মায়া কাজল (১৯৫১) • মন ও জীবন (১৯৫৭) • প্রশস্তি ও প্রার্থনা (১৯৫৮) • উদাত্ত পৃথিবী (১৯৬৪) • দিওয়ান (১৯৬৬) • অভিযাত্রিক (১৯৬৯) • মৃত্তিকার ঘ্রাণ (১৯৭০) • মোর জাদুদের সমাধি পরে (১৯৭২) • Mother of Pearls and Other Poems (English poem) গল্প • কেয়ার কাঁটা (১৯৩৭) • মুক্তিযুদ্ধ মুক্তির জয় (মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থ) ভ্রমণকাহিনি • সোভিয়েতে দিনগুলি (১৯৬৮) স্মৃতিকথা • একাত্তরের ডায়েরি (১৯৮৯) আত্মজীবনী • একালে আমাদের কাল (১৯৮৮) শিশুতোষ • ইতল বিতল (১৯৬৫) • নওল কিশোরের দরবারে (১৯৮১) অনুবাদ • সাঁঝের মায়া - বলশেভনী সুমের্কী (রুশ) (১৯৮৪) ব্যক্তিগত জীবন ১৯৩২ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সেস্বামী নেহাল হোসেনের আকস্মিক মৃত্যু তাকে আর্থিক সমস্যায় নিপতিত করে। একই বছর বেগম রোকেয়ার মৃত্যুও তাকে মর্মাহত করে।সব বাধা অতিক্রম করে তিনি জয় করেছেন মানবসত্তা। ১৯৩৯ সালে কামালউদ্দিন খানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। ১৯৪১ সালে মারা যান তার মা। এরপর ছেলে শোয়েবকে হারান ১৯৬৩ সালে। স্বামী কামালউদ্দিন খানকে হারান ১৯৭৭ সালে। পুরস্কার সুফিয়া কামাল ৫০টির বেশি পুরস্কার লাভ করেছেন। এর মধ্যে কয়েকটি হলো: • বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬২) • সোভিয়েত লেনিন পদক (১৯৭০) • একুশে পদক (১৯৭৬) • নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক (১৯৭৭) • সংগ্রামী নারী পুরস্কার, চেকোশ্লোভাকিয়া (১৯৮১) • মুক্তধারা পুরস্কার (১৯৮২) • বেগম রোকেয়া পুরস্কার (১৯৯৬) • জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার (১৯৯৫) • দেশবন্ধু সি আর দাস গোল্ড মেডেল (১৯৯৬) • স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯৭) শ্রদ্ধাঞ্জলি বেগম সুফিয়া কামাল ১৯৯৯ সালের ২০ নভেম্বর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। বাংলাদেশি নারীদের মধ্যে তিনিই প্রথম এই সম্মান লাভ করেন। এই মহান ব্যক্তিত্বের প্রতি রইল শ্রদ্ধাঞ্জলি।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ফাতেমা তুজ জোহরা - যার কণ্ঠে প্রাণ পায় নজরুলের গান

লক্ষ্মীপুরের গর্বিত কীর্তিসন্তান, মঞ্চসাধনার মহারথী—রামেন্দু মজুমদার

তানভীর মোকাম্মেল