কবি আমির হামজা


বাংলার সাহিত্য 

আমির হামজা। 

জেলার নাম: মাগুরা

লেখকের নাম : তানজীনা ফেরদৌস। 



প্রারম্ভিক জীবন:

কবি মো. আমির হামজা মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার ৩ নম্বর শ্রীকোল ইউনিয়নের বরিশাট গ্রামে ১৯৩১ সালের ৩ মে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ইমারত সরদার আর মা আবিরণ নেছা।


শিক্ষাজীবন :

তিনি কাজীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের পর ভর্তি হন শ্রীপুর মহেশ চন্দ্র পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখানে তিনি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। এরপর আর লেখাপড়া এগোয়নি। কবি বিবাহিত ছিলেন। তার ৬ ছেলে ও ৪ মেয়ে। সন্তানদের মধ্যে এক মেয়ে মারা গেছেন। 

 তার ছেলেদের মধ্যে মো. আসাদুজ্জামান বর্তমানে খুলনা জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। মূলত তার চেষ্টায় কবির কাব্যগ্রন্থগুলো প্রকাশিত হয়। বইগুলো আসাদুজ্জামান দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হাতে উপহার হিসেবে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।


সাহিত্যকর্ম:

জীবদ্দশায় কবি মো. আমির হামজা অনেক গান ও কবিতা লিখেছেন। ২০১৭ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বাঘের থাবা’ প্রকাশিত হয়। কবি জীবিত থাকতেই এই কাব্য গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। সেখানে ৩৫টি কবিতা এবং ৩৬টি গান আছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে লেখা গ্রন্থটি ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পায়। এরপর মুজিববর্ষ উপলক্ষে ‘পৃথিবীর মানচিত্রে একটি মুজিব তুমি’ শীর্ষক গানের বইটি কবির প্রকাশিত দ্বিতীয় গ্রন্থ। বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবন ও তার অবিনাশী রাষ্ট্রদর্শন এখানে উঠে এসেছে। বইটিতে মোট গানের সংখ্যা ৫২টি। এর অধিকাংশই দেশের স্বাধীনতা  সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা। 


কবি আমির হামজা রচিত বই

মাগুরার শ্রীপুরের ‘সারথি কল্যাণ ফাউন্ডেশন’ নামে একটি সংগঠন বইটি প্রকাশ করে।  পরবর্তীতে ‘পৃথিবীর মানচিত্রে একটি মুজিব’ নামে আরেকটি বই প্রকাশিত হয়। যেখানে কবি রচিত ৫২টি গান রয়েছে। এছাড়া ‘একুশের পাঁচালী’ নামে প্রকাশিত আরেকটি বই প্রকাশিত হয়। সেখানে ২৫টি কবিতা রয়েছে। 


গীতিকার ও সুরকার:

কবি আমির হামজা একাধারে কবি, গীতিকার ও সুরকার। তিনি কেবল গীতিকবি নন, নিজে গাইতেনও। প্রতিযোগিতামূলক কবিগান ও পালাগান করে অনেক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তার একটা অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল গানের আসরেই গান লিখে ও সুর করে পরিবেশন করতে পারতেন। তার কবি জীবনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো তিনি তাৎক্ষণিক দেশ ও জাতির হয়ে শ্রোতার চাহিদা অনুযায়ী গান লিখে পরিবেশন করতেন।


মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ :

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে শ্রীপুর বাহিনীতে যোগ দিয়ে গৌরবময় ভূমিকা পালন করেন কবি আমির হামজা। তার নিজ বইয়ের লেখক পরিচিতিতে মুক্তিযুদ্ধের অঙ্কুর অংশগ্রহণের বিষয়টি লেখা আছে। মূলত বাহিনী তথা আকবর বাহিনীর অধিনায়ক আকবর হোসেন মিয়ার আহ্বানে তিনি মুক্তিযুদ্ধে একজন গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে সক্রিয় হবে সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ করেন।


সম্মাননা :

আমির হামজা (৩ মে ১৯৩১ - ২৩ জানুয়ারি ২০১৯) ছিলেন একজন বাংলাদেশী কবি ও মুক্তিযোদ্ধা। সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২২ সালে তিনি মরণোত্তর বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেছিলেন। তিনি একটি হত্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হওয়ায় তাঁকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে তিন দিন পর তার পুরস্কার বাতিল করা হয়।

সারথি ফাউন্ডেশন সম্মাননা (২০১৫)।

মিজাফ তারকা পুরস্কার (২০২০) এ সম্মানিত হন।


শ্রদ্ধাঞ্জলী:

কবি আমির হামজা ছিলেন দক্ষিণবঙ্গের বিখ্যাত কবিয়াল বিজয় সরকারের শিষ্য। অনেক বাঘা বাঘা কবিয়ালের সঙ্গে পালা ও কবিগানের টক্করে আসর মাত করার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আছে তার।


সমগ্র গ্রামবাংলা ছিল কবি আমির হামজার বিচরণক্ষেত্র। বাংলার সংস্কৃতির বাহক হিসেবে জারি ও কবিগানের মধ্যযুগীয় ধারাকে আধুনিকায়নে কবি আমির হামজার অবদান অনস্বীকার্য। মধ্যযুগীয় ধারায় কবিগানের মূল বিষয়বস্তু ছিল ধর্ম, পির-ফকির ও দেব-দেবীর পরস্পরবিরোধী মহিমা কীর্তন ও আদি রসাত্মক চিত্তবিনোদন। আধুনিক যুগে এর পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। পরিবর্তনের এই ধারায় কবিয়াল আমির হামজা ভিন্ন মাত্রা যোগ করেন। তিনি জারি ও কবিগানে দেশপ্রেম, প্রকৃতি, মাটি ও মানুষকে অনুষঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করেন। কবি-র প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। 

# প্রতিবেদন

#মাগুরা

# আমির হামজা ।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ফাতেমা তুজ জোহরা - যার কণ্ঠে প্রাণ পায় নজরুলের গান

লক্ষ্মীপুরের গর্বিত কীর্তিসন্তান, মঞ্চসাধনার মহারথী—রামেন্দু মজুমদার

তানভীর মোকাম্মেল